একটি মোটরসাইকেল বা স্কুটার কেনার পর স্বাধীনভাবে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর আনন্দই আলাদা। কিন্তু আপনি কি জানেন, সঠিক কাগজপত্র ছাড়া পাবলিক রাস্তায় বাইকিং করা আপনাকে কত বড় আইনি বিপদে ফেলতে পারে? বাংলাদেশে মোটরসাইকেল বা স্কুটার চালানোর জন্য দুটি জিনিস সবচেয়ে অপরিহার্য—একটি হলো আপনার বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স (Driving License) এবং অন্যটি আপনার বাহনের রেজিস্ট্রেশন (Registration Card/Smart Card)।
বর্তমানে দেশে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অত্যন্ত কঠোরভাবে কার্যকর রয়েছে। এই আইনে লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশনবিহীন বাইক চালানোর অপরাধে জরিমানার পরিমাণ আগের চেয়ে বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। আজকের আর্টিকেলে আমরা জানবো এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট ছাড়া বাইক চালালে আপনার কী কী আইনি শাস্তি বা জরিমানা হতে পারে।
১. ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া বাইক চালানোর শাস্তি ও জরিমানা
ড্রাইভিং লাইসেন্স হলো সরকার কর্তৃক প্রদত্ত এমন একটি স্বীকৃতি, যা প্রমাণ করে আপনি রাস্তায় নিরাপদে একটি মোটরযান চালানোর জন্য উপযুক্ত। লাইসেন্স ছাড়া বাইক চালানো আইনের চোখে একটি গুরুতর এবং অমার্জনীয় অপরাধ।
আইনের কোন ধারায় শাস্তি হয়?
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এর ধারা ৪ এবং ৬৬ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া পাবলিক প্লেসে বা রাস্তায় কোনো মোটরযান চালাতে পারবেন না।
জরিমানা ও শাস্তির পরিমাণ:
যদি কোনো রাইডার লার্নার (Learner) বা ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া বাইক বা স্কুটার চালান এবং ট্রাফিক পুলিশের হাতে ধরা পড়েন, তবে তার নিচের শাস্তি হতে পারে:
- আর্থিক জরিমানা: সর্বোচ্চ ২৫,০০০ (পঁচিশ হাজার) টাকা পর্যন্ত জরিমানা।
- কারাদণ্ড: জরিমানার পাশাপাশি অথবা কেবল অনূর্ধ্ব ৬ মাসের কারাদণ্ড হতে পারে।
- ভুয়া লাইসেন্সের ক্ষেত্রে (ধারা ৪+৬৭): যদি কেউ জাল বা ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যবহার করে বাইক চালান, তবে জরিমানা ১ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং ৬ মাস থেকে ২ বছরের জেল পর্যন্ত হতে পারে।
২. রেজিস্ট্রেশন ছাড়া বাইক বা স্কুটার চালানোর আইনি পরিণতি
শোরুম থেকে নতুন স্কুটার বা বাইক কেনার পর বিআরটিএ (BRTA) থেকে সাময়িক বা স্থায়ী রেজিস্ট্রেশন নম্বর প্লেট এবং স্মার্টকার্ড সংগ্রহ করা বাধ্যতামূলক। রেজিস্ট্রেশন নম্বর ছাড়া রাস্তায় গাড়ি নামানো সম্পূর্ণ অবৈধ।
আইনের কোন ধারায় শাস্তি হয়?
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এর ধারা ১৬ এবং ৭২ অনুযায়ী, কোনো মোটরযান যথাযথভাবে নিবন্ধিত বা রেজিস্টার্ড না করে রাস্তায় চালানো যাবে না।
জরিমানা ও শাস্তির পরিমাণ:
যদি আপনার বাইকের কোনো রেজিস্ট্রেশন বা বিআরটিএ-এর বৈধ নম্বর প্লেট না থাকে, তবে ট্রাফিক পুলিশ সরাসরি মোটরযান আইনে মামলা দেবে:
- আর্থিক জরিমানা: সর্বোচ্চ ২৫,০০০ (পঁচিশ হাজার) টাকা পর্যন্ত জরিমানা।
- কারাদণ্ড: অপরাধের তীব্রতা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৬ মাসের জেল হতে পারে।
- গাড়ি ডাম্পিং: রেজিস্ট্রেশনবিহীন বা ‘অন টেস্ট’ (On Test) লেখা গাড়ি রাস্তায় পেলে ট্রাফিক পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে গাড়িটি জব্দ করে ডাম্পিং স্টেশনে পাঠিয়ে দিতে পারে।
৩. লার্নার বা শিক্ষানবিস লাইসেন্স নিয়ে বাইক চালানোর নিয়ম
অনেকেই প্রশ্ন করেন, “আমার তো লার্নার কার্ড আছে, আমি কি রাস্তায় একা একা বাইক বা স্কুটার চালাতে পারব?”
- আইনের নিয়ম: লার্নার লাইসেন্সের মূল শর্ত হলো—আপনি যখন রাস্তায় বাইক বা স্কুটার চালানো প্র্যাকটিস করবেন, তখন আপনার পেছনে একজন অভিজ্ঞ এবং বৈধ লাইসেন্সধারী ট্রেইনার বা চালক উপস্থিত থাকতে হবে।
- একা চালালে জরিমানা: আপনি যদি লার্নার কার্ড নিয়ে মেইন রাস্তায় একা একা রাইড করেন কিংবা পেছনে পিলিয়ন নিয়ে ঘুরে বেড়ান, তবে ট্রাফিক পুলিশ সেটিকে ‘লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো’ হিসেবে গণ্য করে মামলা দিতে পারে।
একনজরে অপরাধ, ধারা ও জরিমানার চার্ট (কুইক টুল)
| অপরাধের বিবরণ | সড়ক পরিবহন আইন (ধারা) | সর্বোচ্চ জরিমানার পরিমাণ | সম্ভাব্য কারাদণ্ড |
| লাইসেন্স ছাড়া বাইক চালানো | ধারা ৬৬ | ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত | সর্বোচ্চ ৬ মাস |
| রেজিস্ট্রেশন ছাড়া বাইক চালানো | ধারা ৭২ | ২৫,০০০ – ৫০,০০০ টাকা | সর্বোচ্চ ৬ মাস |
| ভুয়া/জাল লাইসেন্স ব্যবহার | ধারা ৬৭ | ১,০০,০০০ থেকে ৫,০০,০০০ টাকা | ৬ মাস থেকে ২ বছর |
| মেয়াদোত্তীর্ণ ট্যাক্স টোকেন | ধারা ৭৬ | ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত | — |
একজন সচেতন স্কুটার রাইডারের করণীয়
১. আগে লাইসেন্স, পরে বাইক: বাইক বা স্কুটার কেনার আগেই লার্নার কার্ড করে ড্রাইভিং টেস্টের প্রস্তুতি নিন এবং বৈধ লাইসেন্স সংগ্রহ করুন।
২. শোরুম পেপার্স ও রেজিস্ট্রেশন: নতুন স্কুটার কেনার পর শোরুমের অস্থায়ী কাগজ দিয়ে বেশিদিন রাইড করবেন না। দ্রুত বিআরটিএ-তে ফাইল জমা দিয়ে অন্তত ডিজিটাল নম্বর প্লেট এবং সাময়িক প্রাপ্তিস্বীকার রসিদ (Acknowledgement Slip) সাথে রাখুন।
৩. সবসময় মূল কপি সাথে রাখুন: রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশ চেকপোস্টে ধরলে আপনার লাইসেন্স এবং বাইকের কাগজপত্রের মূল কপি (অথবা বিআরটিএ-এর ডিজিটাল কপি) প্রদর্শন করুন।
amarscooter.com-এর মূল লক্ষ্য হলো আপনাকে আইনি ঝামেলামুক্ত এবং নিরাপদ রাইডিংয়ের ব্যাপারে সচেতন করা। ২৫,০০০ টাকা জরিমানা কিংবা জেলের মতন বড় আইনি ঝামেলা এড়াতে আজই আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং স্কুটারের রেজিস্ট্রেশন আপডেট করে নিন। মনে রাখবেন, সঠিক আইনি কাগজপত্র থাকা একজন ভালো এবং দায়িত্বশীল নাগরিকের পরিচয়।
আপনার প্রতিটি স্কুটার রাইড হোক আইনি দুশ্চিন্তামুক্ত ও নিরাপদ!

