বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক অভূতপূর্ব বিপ্লব এনেছে এক্সপ্রেসওয়ে এবং উন্নত চার বা আট লেনের জাতীয় মহাসড়কগুলো। কম সময়ে দূর-দূরান্তে যাতায়াতের জন্য এই রাস্তাগুলো চমৎকার হলেও, মোটরসাইকেল ও স্কুটার রাইডারদের জন্য এখানে রয়েছে বেশ কিছু আইনি কড়াকড়ি এবং সুনির্দিষ্ট সরকারি নির্দেশনা।
পদ্মা সেতু, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে বা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাসড়কসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ হাইওয়েতে বাইক চলাচলের নিয়ম এবং নিষেধাজ্ঞা নিয়ে অনেক রাইডারের মনেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। আজকের আর্টিকেলে আমরা এক্সপ্রেসওয়ে ও হাইওয়েতে স্কুটার বা বাইক চালানোর সরকারি নিয়ম, গতিসীমা এবং নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. এক্সপ্রেসওয়েতে মোটরসাইকেল ও স্কুটার চলাচলের সরকারি নিয়ম
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BRTA) এবং সেতু বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের এক্সপ্রেসওয়েগুলোতে টু-হুইলার বা মোটরসাইকেল চলাচলের ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু নিয়ম জারি করা হয়েছে:
- লেন ব্যবহারের নিয়ম: এক্সপ্রেসওয়ের মূল লেনে সাধারণত দ্রুতগতির ভারী যানবাহন (বাস, ট্রাক, প্রাইভেটকার) চলাচল করে। বাইক বা স্কুটার নিয়ে চললে সবসময় বাম পাশের নির্ধারিত লেন বা সার্ভিস লেন (যদি থাকে) ব্যবহার করা উচিত।
- টোল প্লাজার নিয়ম: এক্সপ্রেসওয়ে বা সেতুতে প্রবেশের সময় মোটরসাইকেলের জন্য নির্ধারিত টোল বুথ ব্যবহার করতে হবে। ডিজিটাল টোল সিস্টেম থাকলে লেন মেনে সারিবদ্ধভাবে টোল প্রদান নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
- ডিজাইন ও সিসি (CC) সীমা: হাইওয়ে বা এক্সপ্রেসওয়েতে চলাচলের জন্য বাইকের ইঞ্জিন ক্যাপাসিটি এবং টায়ারের গ্রিপ ভালো হওয়া জরুরি। বিশেষ করে হালকা ও ছোট চাকার স্কুটার নিয়ে হাইওয়েতে চলার সময় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
২. হাইওয়ে ও এক্সপ্রেসওয়েতে গতিসীমা (Speed Limit)
গতির রোমাঞ্চ হাইওয়েতে মারাত্মক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী এক্সপ্রেসওয়েতে মোটরসাইকেলের জন্য সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে:
- সর্বোচ্চ গতিসীমা: দেশের এক্সপ্রেসওয়েগুলোতে মোটরসাইকেলের সর্বোচ্চ গতিসীমা সাধারণত ৬০ কি.মি./ঘণ্টা নির্ধারণ করা হয়েছে (ক্ষেত্রবিশেষে সাইনপোস্টে সর্বোচ্চ গতি ৮০ কি.মি. লেখা থাকলেও বাইকের জন্য ৬০ কি.মি. বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়)।
- গতিসীমা লঙ্ঘনের জরিমানা: হাইওয়েতে নির্ধারিত গতিসীমা পার করলে স্পিড গানের (Speed Gun) মাধ্যমে ট্রাফিক পুলিশ তাৎক্ষণিক মামলা দিতে পারে, যার জরিমানা সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
৩. নির্দিষ্ট কিছু হাইওয়ে ও সেতুতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা
নিরাপত্তার স্বার্থে সরকার বিভিন্ন সময়ে নির্দিষ্ট কিছু মেগা প্রজেক্ট এবং এক্সপ্রেসওয়েতে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বাইক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা বা বিশেষ শর্ত আরোপ করে থাকে:
- পদ্মা সেতুতে বাইক চলাচল: বর্তমানে পদ্মা সেতুতে মোটরসাইকেল চলাচলের অনুমতি রয়েছে, তবে তা সম্পূর্ণ শর্তসাপেক্ষ। চালক ও পিলিয়নের হেলমেট থাকা, গতিসীমা (সর্বোচ্চ ৬০ কি.মি.) মানা এবং সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে ছবি বা ভিডিও তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নিয়ম অমান্য করলে মোটা অঙ্কের জরিমানা ও বাইক জব্দ করার বিধান রয়েছে।
- ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (Elevated Expressway): উদ্বোধনের পর থেকেই ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নিরাপত্তা জনিত কারণে মোটরসাইকেল, স্কুটার এবং থ্রি-व्हीলার চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
- ঈদ বা উৎসবকালীন নিষেধাজ্ঞা: প্রতি বছর ঈদ-উল-ফিতর এবং ঈদ-উল-আজহার সময় মহাসড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ ও দুর্ঘটনা এড়াতে সরকার সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিনের জন্য এক জেলা থেকে অন্য জেলায় মোটরসাইকেল চলাচলের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বা কড়াকড়ি আরোপ করে থাকে।
৪. হাইওয়ে বা এক্সপ্রেসওয়েতে স্কুটার রাইডারদের জন্য বিশেষ সতর্কতা
যেহেতু স্কুটারের চাকা সাধারণ মোটরসাইকেলের চেয়ে ছোট হয় এবং এর ওজন কিছুটা হালকা হয়, তাই হাইওয়েতে স্কুটার চালানোর সময় নিচের বিষয়গুলো অবশ্যই মাথায় রাখুন:
- ভারী যানবাহনের বাতাস (Wind Blast): হাইওয়েতে যখন কোনো বড় বাস বা দূরপাল্লার ট্রাক তীব্র গতিতে আপনার স্কুটারের পাশ দিয়ে যাবে, তখন বাতাসের একটি বড় ধাক্কা বা ‘উইন্ড ব্লাস্ট’ তৈরি হয়। স্কুটার হালকা হওয়ায় নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি থাকে। তাই বড় গাড়ি থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন।
- টায়ার প্রেশার ও ব্রেকিং: হাইওয়ের পিচঢালা রাস্তা গরম থাকে। তাই রাইডের আগে টায়ার প্রেশার চেক করে নিন। স্কুটারে যেহেতু গিয়ার থাকে না, তাই হুট করে ব্রেক না কষে গ্রাজুয়ালি (ধীরে ধীরে উভয় ব্রেক একসাথে) ব্রেক চাপুন।
- হাইওয়ে ভিজিবিলিটি: দিনের বেলাতেও হাইওয়েতে রাইড করার সময় বাইকের হাই-বিম বা পাস লাইট ব্যবহার করুন এবং অবশ্যই রিফ্লেক্টিভ জ্যাকেট পরিধান করুন, যেন দূর থেকে অন্য গাড়ির চালকরা আপনাকে সহজে দেখতে পায়।
একনজরে আইনি নির্দেশনা ও জরিমানা (কুইক গাইড)
| বিষয়ের বিবরণ | সরকারি নিয়ম / নিষেধাজ্ঞা | নিয়ম ভাঙলে আইনি পরিণতি |
| ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে | মোটরসাইকেল ও স্কুটার চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ | এক্সপ্রেসওয়েতে প্রবেশ করালে মামলা ও গাড়ি জব্দ |
| হাইওয়েতে সর্বোচ্চ গতি | ৬০ কি.মি./ঘণ্টা (নির্দিষ্ট জোনে ভিন্ন হতে পারে) | গতিসীমা লঙ্ঘনে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা |
| সেতু বা হাইওয়েতে ছবি তোলা | সেতুর ওপর বাইক থামানো বা ছবি তোলা সম্পূর্ণ অবৈধ | ট্রাফিক পুলিশ কর্তৃক মামলা ও জরিমানা |
| ঈদ ও উৎসবকালীন নিয়ম | সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আন্তঃজেলা চলাচলে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা | চেকপোস্টে জরিমানা ও ঘুরিয়ে দেওয়া |
এক্সপ্রেসওয়ে বা মহাসড়ক আমাদের যাতায়াতকে সহজ করলেও সামান্য অসতর্কতা বড় বিপদের কারণ হতে পারে। amarscooter.com-এর পক্ষ থেকে আমাদের পরামর্শ—হাইওয়ে বা এক্সপ্রেসওয়েতে রাইড করার সময় সরকারি সকল নির্দেশনা ও গতিসীমা কঠোরভাবে মেনে চলুন। নিষিদ্ধ ঘোষিত রাস্তায় জোরপূর্বক প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকুন। আপনার সচেতনতাই আপনার এবং আপনার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
নিরাপদে রাইড করুন, আইন মেনে চলুন!

